উক্তির কারণপ্রথম“আরবি, ফারসি ভাষা থেকে ব্যাপকভাবে আর নতুন শব্দ বাংলাতে ঢুকবে না।”
এই উক্তির পেছনে লেখকের যুক্তি হলো—ভাষায় বিদেশি শব্দের প্রবেশ নির্ভর করে সেই ভাষার সঙ্গে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানচর্চার যোগাযোগের উপর। একসময় আরবি ও ফারসি ভাষার সঙ্গে বাঙালির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল—ধর্ম, শাসনব্যবস্থা, সাহিত্য ও শিক্ষার মাধ্যমে। ফলে বিপুল পরিমাণ আরবি–ফারসি শব্দ বাংলায় প্রবেশ করেছিল।
কিন্তু আধুনিক যুগে তরুণ সমাজের মধ্যে আরবি ও ফারসি ভাষা শেখার আগ্রহ ক্রমশ কমে গেছে। পাশাপাশি আরব–ইরান অঞ্চলে আধুনিক বিজ্ঞান ও জ্ঞানচর্চায় নতুন শব্দ সৃষ্টির যে প্রভাব একসময় ছিল, তা আগের মতো শক্তিশালী নয়। তাই এই ভাষা দুটি থেকে নতুন শব্দ ব্যাপকভাবে বাংলায় ঢোকার সম্ভাবনা ক্ষীণ—এই কথাই লেখক প্রথম উক্তিতে বোঝাতে চেয়েছেন।
দ্বিতীয় উক্তির কারণ
“অচলিত অনেক আরবি–ফারসি শব্দ নতুন মেয়াদ পাবে।”
অন্যদিকে লেখক দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে বাংলা ভাষায় আগে থেকে প্রবেশ করা আরবি–ফারসি শব্দ কখনোই অচল হয়ে যাবে না। বাংলা সাহিত্য ও ভাষার ইতিহাসে এই শব্দগুলির শিকড় গভীর। মধ্যযুগের চণ্ডীমঙ্গল থেকে শুরু করে হুতোম প্যাঁচার নকশা পর্যন্ত বহু গ্রন্থে আরবি–ফারসি শব্দের স্বাভাবিক ও সাবলীল ব্যবহার দেখা যায়।
আধুনিক লেখকরা এবং গবেষকেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে প্রাচীন বাংলা সাহিত্য পড়ার ফলে এইসব প্রায় বিস্মৃত শব্দ নতুন করে আবিষ্কার করছেন এবং সেগুলিকে আধুনিক লেখালিখিতে প্রয়োগ করছেন। এই কারণেই লেখক বলেছেন যে অচলিত বহু আরবি–ফারসি শব্দ নতুন অর্থ ও নতুন প্রসঙ্গে আবার জীবন্ত হয়ে উঠবে—অর্থাৎ তারা “নতুন মেয়াদ” পাবে।
উপসংহার
সুতরাং দেখা যায়, সৈয়দ মুজতবা আলীর দুটি উক্তি পরস্পরবিরোধী নয়। একদিকে তিনি ভবিষ্যতে আরবি–ফারসি ভাষা থেকে নতুন শব্দের আগমন সীমিত হবে বলে মনে করেছেন, অন্যদিকে তিনি অতীতে বাংলায় প্রবেশ করা আরবি–ফারসি শব্দগুলির স্থায়িত্ব ও পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা স্বীকার করেছেন। এই দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়েই লেখক বাংলা ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন ও নব নব সৃষ্টির ধারাকে স্পষ্ট করেছেন।
Comments
Post a Comment